মুসলিম আইন অনুযায়ী সন্তানের  কাস্টোডী কে পাবে

মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী সন্তানের  কাস্টোডী কে পাবে এই নিয়ে বিবেধ থাকলেও , মহান আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের একটি নেয়ামত হলো পরিবার । একজন পুরুষ ও একজন মহিলার সমন্বয়ে একটা সংসার শুরু হয় । এই দুইজনের সন্মিলিত চেষ্টা আর ভালোবাসার ফসল হিসাবে তাদের সন্তান দুনিয়ায় আসে, এই দুইজন এর উপরেই গুরু দ্বায়ীত্ব হলো এই নতুন অতিথিকে দুনিয়ার জন্য উপযোগী করে তোলা । কিন্তু এই নতুন অতিথিকে দুনিয়ার জন্য উপযোগী করার  জন্য পিতা-মাতা সব সময় একসাথে থাকা হয়ে উঠেনা,অনেক সময় পিতা-মাতা এক জন আরেক জন থেকে আলাদা হয়ে যায় ।  আর আলাদা হওয়ার এই বিষয় কে তালাক বলে । আর তালাক  হওয়ার পর সন্তানক কার কাছে থাকবে তাকে কাস্টোডী / হেফাজত বলা হয় ।

মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, প্রায় সব ক্ষেত্রে বাবা সন্তানের প্রকৃত আইনগত অভিভাবক । এই আইনের আওতায় সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং জিম্মাদারিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয় । তবে সাধারণ ক্ষেত্রে সন্তানের দেখাশুনা, অভিভাবকত্ব এবং ভরণপোষণের বিষয়গুলো অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০ এবং পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয় । এই আইন অনুযায়ী, অভিভাবক বলতে যে ব্যক্তি কোন নাবালকের শরীর অথবা সম্পত্তির বা শরীর ও সম্পত্তি উভয়ের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত থাকবে তাকে বুঝাবে  ।

কিন্তু সব তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ কোর্টে যায় না তাই চাইল্ড কাস্টোডি ব্যপারে সুনির্দিস্ট দ্বায় দ্বায়ীত্ব বন্টন করা থাকে না, মা চায় সন্তান তার সাথে থাকুক আর বাবা তার অধিকার ছাড়তে চায় না। আবার কখনো এর বিপরীতও হয়। আবার আমাদের মত গরীব দেশে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মায়ের আর্থিক অবস্থা এত সংগতি পুর্ন থাকে না যে সে নিজের খরচের সাথে সাথে সন্তানের লেখা পড়া ভরণপোষন এর খরচ চালাতে পারবে ।

সন্তান তত্বাবধানের প্রাথমিক দ্বায় দ্বায়িত্ব সন্তানের পিতা-মাতার । ইসলামে বাবার উপরেই অর্থনৈতিক দিকটা দেওয়া হয়েছে, পুরুষ সংসারের কর্তা, তার উপরে সংসারের যাবতীয় খরচ যোগাড় করার দ্বায়ীত্ব ।

যদি এমন অবস্থা উদ্ভুত হয় যে বিবাহ তালাকেই নিস্পত্তি হয় , তখন খেয়াল রাখতে হবে এই তালাক এর কারণে   যাতে সন্তানদের কোন রকম সমস্যা না হয় । সন্তানরা পিতা-মাতার কাছে আল্লাহর আমানত, তার কোন অন্যথা হওয়া যাবেনা ।

সন্তান যতক্ষন না তার নিজের মৌলিক প্রয়োজন (বেসিক নীড) যেমন টয়লেট সামলানো, খাবার খাওয়া, কাপড় পরার মত কাজ গুলি নিজে নিজে না করতে পারে ততক্ষন শিশু মায়ের তত্বাবধানে থাকবে । এই সময়টা সাত বছর পর্যন্ত বলে স্বীকৃত।

ইমাম আল হাসকাফী রঃ বলেন “একটি বালকের তত্বাবধানের দ্বায়ীত্ব তার মায়ের ততো ক্ষন পর্যন্ত যতক্ষন সে তার নিজের যত্ন নিতে না পারে । এই সময়টা প্রায় সাত বছর পর্যন্ত, তখন বালক নিজের ব্যাক্তিগত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির দেখভাল করতে পারে”। –[ রাদ আল মুহতার ৩/৫৬৬]

আর বালিকা সন্তানের বেলায় যতক্ষন  পর্যন্ত সে সাবালিকা হয় (ঋতুমতী হয়) আর এই সময়টা তার জন্য ৯ বছর ব’লে স্বীকৃত হয়েছে”। আল মাওসিলি -আল ইক্ততিয়ার লি তা’লিল –[ আল মুখতার ৩/২৩৭]

মায়ের কাছ থেকে কাস্টোডী / হেফাজতের  দ্বায়ীত্ব রদ করা হইব যদি:-

১/ মা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে ।

২/ প্রকাশ্যে কোন অবৈধ যৌণাচার করে যাতে সন্তানের ভরণপোষনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া যায় ।

৩/ ঘর থেকে প্রতিনিয়ত বাইরে বের হয় যার ফলস্রুতিতে সন্তানের দেখভালের ভালো ভাবে হয়না ।

৪/ যদি ভরণপোষন এর জন্য সে কোন ভাতা দাবী করে যেইখানে সন্তানের ভরনপোষন করার জন্য অন্য কোন নারী বিনা ভাতায় তা করতে প্রস্তুত থাকে ।

উপরোল্লিখিত শর্তে সন্তানের প্রতি মায়ের “চাইল্ড কাস্টোডি” তত্বাবধানের অধিকার হারাইবে। আর তা ন্যস্ত হইবে নিম্নলিখিত ব্যাক্তিবর্গের প্রতি:- (ক্রমান্বয়ে একজনের অবর্তমানে পরের জন)

 ১/ সন্তানের নানী বা তার পরের কেউ ।

২/ সন্তানের দাদী বা তার পরের কেউ

৩/ আপন বোন ।

৪/ মাতৃপক্ষের সৎবোন ।

৫/ পিতৃপক্ষের সৎবোন ।

৬/ খালা ।

৭/ ফুফু ।

স্ত্রী পক্ষের উপরে বর্নীত সব সম্পর্কের অবর্তমানে স্বামী পক্ষের নিম্ন বর্নীত আত্মীয়র কাছে দ্বায়ীত্ব বর্তাইবে :-

(ক্রমান্বয়ে একজনের অবর্তমানে পরের জন)

১/  বাবা ।

২/ দাদা ।

৩/ আপন ভাই ।

৪/ পিতৃপক্ষের সৎভাই ।

৫/ মাতৃপক্ষের সৎভাই ।

এই ফতোয়ার পিছনে যুক্তি হইল মায়ের ও মাতৃপক্ষের মহিলাদের পক্ষেই একজন শিশুকে যথেস্ট আদর, মায়া, মমতা দিয়ে লালন পালন করা সম্ভব । একজন বালকের ৭ বছর বয়সের পর থেকে  তার জন্য পুরুষালী কার্জ কলাপ , শাররীক/শ্রম সক্ষমতা, লেখাপড়া ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়া জরুরী তাই পিতার গাইডেন্স/দেখভাল করা জরুরী বোধ করা হয় ।

আর কন্যা সন্তান  সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকা দরকার যাতে সে মেয়েলী ব্যাপারগুলি ভালোভাবে মায়ের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহন করতে পারে ।

একবার একজন মহিলা রাসুল সাঃ এর কাছে অভিযোগ করলেন যে তার প্রাক্তন স্বামী তার সন্তানকে নিয়া যেতে  চাইতেছে। রাসুল সাঃ বলিলেন “তুমি যদি পুণঃবিবাহ না কর, তাহা হইলে সন্তানে তোমার অধিকার বেশী” –

[ সুনান আবু দাউদ ২২৭৬ মুস্তাদ্রাক আল হাকিম ২/২০৭]

বালকের তত্বাবধান পিতার প্রতি অর্পিত হইলে বালকের সাবালকত্ব প্রাপ্তির পরে বালক ‘মুক্ত’! সে তখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারিবে, সে কার সাথে থাকিবে অথবা নিজেই আলাদা থাকিবে।
বালিকার দ্বায়ীত্ব পিতার প্রতি অর্পিত হইলে সে পিতার তত্বাবধানেই থাকিবে যতক্ষন না পর্যন্ত তার বিবাহ হইয়া যায় । [ কাদরী পাশা, হানাফি আর্টিক্লেস ৪৯৬, ৪৯৯]

স্বামী অথবা স্ত্রী তত্বাবধানের দ্বায়ীত্ব যার কাছেই থাকুক ‘অপর পক্ষে’র নিজ সন্তানের সাথে দেখা করার সমান অধিকার আছে।কিন্তু দেখা যায় একপক্ষে অপর পক্ষরে ‘শিক্ষা’ দিবার জন্য সন্তানরে ‘ঘুঁটি’ হিসাবে ব্যবহার করে । যা ইসলামের পরিপন্থী ।

সন্তানের তত্বাবধানের দ্বায়ীত্ব যার কাছেই থাকুক তার ভরণপোষনের দ্বায়ীত্ব সম্পুর্ন পিতার । সুস্থ ছেলে সন্তান হইলে তার সাবালকত্ব পাওয়া পর্যন্ত আর মেয়ে সন্তান হইলে তার বিবাহ পর্যন্ত আর অসুস্থ্য বিকলাংগ সন্তান হইলে সারা জীবন পিতাকে ভরণপোষনের খরচ চালাতে হবে ।

“যদি মায়ের কাছে সন্তানের তত্বাবধানের দ্বায়ীত্ব বর্তায়, আর মায়ের কোন থাকার জায়গা না থাকে তবে পিতাকে তাদের থাকার জায়গাও ঠিক  করে দিতে হবে ’’ [রাদ আল মুহতার – ইবন আবিদিন]

ধন্যবাদান্তে,

জুরিস্ট কমিউনিকেশন ল ফার্ম

মোবাইলঃ 01886012863

ইমেইলঃ juristcommunication@gmail.com

Leave a Reply